সাগর-রুনি হত্যার ১৪ বছরেও অমীমাংসিত রহস্য

সাগর-রুনি হত্যার ১৪ বছরেও অমীমাংসিত রহস্য

চ্যানেল নিউজ ডেস্ক : রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসায় সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে নৃশংসভাবে খুন হন তারা। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো শনাক্ত হয়নি হত্যাকারীরা; শেষ হয়নি তদন্তও।

সাগর ছিলেন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক এবং রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ড দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত সক্ষমতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে তদন্ত সংস্থা, কিন্তু মামলার অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

১২৪ বার সময় বৃদ্ধি

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ এ পর্যন্ত ১২৪ বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল না করায় তদন্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন আদালত। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমান তদন্ত কর্মকর্তাকে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং আগামী ১ এপ্রিল নতুন তারিখ ধার্য করেছেন।

আলামত নষ্টের অভিযোগ

বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বর্তমানে তদন্তকারীদের হাতে কিছু ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো ভৌত প্রমাণ নেই। এ অভিযোগ সত্য হলে তা তদন্ত জটিলতার বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

পিবিআই প্রধান ও টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, আগের তদন্তে যেসব বিষয় গুরুত্ব পায়নি, সেগুলো নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার ভাষ্য, তদন্তকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে; তবে এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না কারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত।

টাস্কফোর্স গঠন, র‌্যাবকে সরানো

প্রথমে মামলাটি শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা হয়। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ডিবি, এরপর হাইকোর্টের নির্দেশে একই বছরের ১৮ এপ্রিল দায়িত্ব দেওয়া হয় র‌্যাবকে। দীর্ঘ সময় তদন্ত করেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন এবং ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেন। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত থেকে র‌্যাবকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে। বর্তমানে পিবিআই’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিজুল হক তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পরিবারের ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা

নিহত রুনির ভাই ও মামলার বাদী নওশের আলম রোমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত বছরেও হত্যাকারীদের শনাক্ত না হওয়া হতাশাজনক। আগের সরকারের সময়ে তারা বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে আশাবাদী হলেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তারা আবারও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।

হত্যাকাণ্ডের সময় বাসায় উপস্থিত ছিলেন দম্পতির পাঁচ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান মেঘ। বর্তমানে তার বয়স ১৯। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্যই বেদনাদায়ক।

প্রশ্নের মুখে তদন্ত সক্ষমতা

দীর্ঘ ১৪ বছরেও চাঞ্চল্যকর এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত প্রায় শেষ—এমন বক্তব্য অতীতেও এসেছে, কিন্তু দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় জনমনে সংশয় কাটছে না।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড এখন শুধু একটি অপরাধ তদন্তের বিষয় নয়; এটি বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবারের একটাই দাবি—দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনা হোক।

Share this news as a Photo Card

শেয়ার করুন

2 responses to “সাগর-রুনি হত্যার ১৪ বছরেও অমীমাংসিত রহস্য”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

themesbazartvsite-01713478536
11 February 2026

সাগর-রুনি হত্যার ১৪ বছরেও অমীমাংসিত রহস্য

নিউজ লিংক কমেন্টসে